সন্ধ্যে ঘনিয়ে এসেছে। ঝিঁঝিপোকাদের শব্দ ভেসে আসছে বাড়ির পশ্চিম পাশের বাঁশ ঝাড় থেকে। বিশাল আয়তনের বাঁশঝাড়, লোকমুখে শুনা যায় এখানে অনেকের সাথে ঘটেছে অঘটন! প্রতিটি সন্ধ্যে মানে প্রতিদিন নতুন কিছুর আবির্ভাব! কোনো সময় অচেনা নামে, ডাকে, তো কোনো সময় ছোট্ট বাচ্চাদের কাঁন্নার সুর বাজে লাগাতার। তবে সন্ধ্যার কিছুটা পর আবার সব নিস্তব্ধ। একদম নিশ্চুপ কোলাহল বিহীন একটা ঝাড়।মানে সেই বাঁশ ঝাড় যার রহস্য ভেদ করতে পারেনি আজ অবধি।কেন এমন হয়! প্রশ্ন জাগে সবার মনে। তবে সেই প্রশ্নটা নিছক প্রশ্ন হয়েই থেকে গেল সবার মধ্যে।কেউ আগ বাড়িয়ে প্রশ্নের জবাব খুঁজতে যায় নি।কারণ যেই এই প্রশ্নের জবাব খুঁজতে গিয়েছে।বিনিময় মহা বিপদ নেমে এসেছে তার জীবণে।তার প্রত্যেকটি কাজে। এমন ঘটনা একটা দুটো নয়।গ্রামের প্রায় বেশকিছু সংখ্যক লোকের সাথেই এটা হয়েছে। সবাই এড়িয়ে চলতে চায়এই ঝাড়টা। গ্রামের লোকেরা এই বাঁশ ঝাড়কে ডাকে মৃত্যুর ডাক। কি জন্যে বা কী উদ্দেশ্যে নামটা রাখা হয়েছে কেউ জানে না বা কে রেখেছেসঠিক তাও জানা নেই।পূর্বের বংশের কাছ থেকে শুনে আসছে এবং এটাকেই ধরে রেখেছে গ্রাম বাসী আজোও। কিন্তু সবাই মৃত্যুর ডাক বাঁশের ঝাড় এড়িয়ে যেতে চাইলেও পারে না। গ্রামের মধ্যবর্তী একটা হাঁট। সেখানে গ্রামের মানুষগণ বাজার করতে যায়।কেউ জমিতে ফলানো ফসল, শাক, সবজি, ইত্যাদি বিক্রি করতে যায়।তবে সেই বাজারে যেতে হলে একটাই রাস্তা।একটাই পথ। গ্রামের পশ্চিম পাশে বিস্তর জমিন।সেখানে কৃষক ভাইয়েরা চাষাবাদ করেন। সেই বিস্তর জমির পাশ ঘেঁষেই সেই মুত্যুর ডাক নামের বাঁশ ঝাড়টা।একেবারে গ্রামের প্রধান সড়কটার গা ঘেঁষে প্রায় অনেকটা পথ দখল করে রেখেছে। দুইপাশে বাঁশঝাড় তার মধ্য বরাবর সেই গ্রামের প্রধান সড়ক।যা দিয়ে দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় কাজে বাজারে যান গ্রামের প্রতিটি মানুষ। এই তো বেশ কিছু দিন হলো।গ্রামের শফিকুর রহমানের ছেলে আজগর আলী, বাজার থেকে ফিরছিল। কিন্তু সে দিন খুব তাড়াতাড়ি ফিরবে বলে আশা করলেও ভাগ্যের পরিহাসে সেদিন সন্ধ্যারবেশকিছু পর বাজার থেকে সবে মাত্র রওনা দিয়েছে। বাড়িতে ফিরতে ফিরতেঅন্ধকার ঘনিয়ে ভূতুড়ে পরিবেশ তখন পুরো বাজার ছমছম করছে। কিন্তু কীআর করা! বাড়ি তো ফিরতে হবে।না হলে আস্তে, আস্তে বাজারের লোক জনশূণ্য হয়ে যাবে।তখন কী একা থাকব? মোটেও না। তবে সেই ভয় মনের ভেতর! যদি মুত্যুর ডাক বাঁশ ঝাড়ে অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো ঘটনা ঘটে যায়? তখন? সে কি বেঁচে আসতে পারবে? নাকি শেষমেষ ভূতের কবলে পড়েমরতে হবে? এমন অজানা চিন্তা ভাবনা তখন আজগর আলীর মনকে বলছিলো"তুই চাস নে " তাও মনের বিরুদ্ধে গিয়ে রওনা হলো এই ভরসায় যে মুত্যু তো একদিন আগে পরে হবেই। সুতরাং ভয় করে কোনো ফায়দা নেই। সেদিন বাজারে সে জমিনের ফলানো সবজি, টমেটো আর কাঁচা মরিচ বিক্রি করতে গিয়েছিল। বিক্রি শেষ হতে, হতেই দেরী হয়। ডান হাতে হারিকেন আরবাম হাতে সবজি নিয়ে আসার ঝুঁড়ি। কাঁপা, কাঁপা পায়ে হেঁটে প্রায় সেই জঙ্গলের কাছাকাছি চলে এসেছে। কিন্তু ভয়টা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে চারপাশের পরিবেশটা।ঘুটঘুটে অন্ধকার।ব্যাংঙ্গের ডাক, ঝিঁঝিপোকাদের ঝিঝি শব্দ ভেসে আসছে মৃত্যুর ডাক বাঁশঝাড় থেকে। এর মধ্যে সে কী পারবে নিজেকে বাঁচিয়ে ফিরে যেতে! নাহ্। নাকি হ্যাঁ? তবে সেটা সময়বলে দিবে। আজগর একটু দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করল।যদি এই রাস্তা দিয়ে কেউ আসে! তো সে তার সাথে যাবে।কোনো ভাবেই সম্ভব না একা একা দুই পাশে বাঁশঝাড় মধ্যখানে রাস্তাটা দিয়ে যাওয়া। কিন্তু বেশ কিছু সময় থাকারপরেও কেউ আসছে না। আজগর মনে মনে বললো।হায় রে আমার পুড়া কপাল। আমি যে কেনো এই বাজারে গেলাম।একবার যদি ফিরে যেতে পারি তো আর কোনো দিনসন্ধ্যের পর আসব না বাড়ি হয় বিক্রি হোক না হয় না হোক। হারিকেন এর আলোতে যতোটুক দেখা যাচ্ছে কেউ নেই আশপাশে। গ্রামের মানুষ এই সময়টাতে খেয়ে দেয়ে ঘুম গিয়ে অর্ধমৃত প্রায়। তবে আর অপেক্ষা নয়।কোনো মতেই নয়।কারণ রাত যতো বাড়বে ততোই বিপদ।মহা বিপদ নেমে আসবেএই অন্ধকার মৃত্যুর ডাক ঝাড়ে। কাঁপা, কাঁপা পায়ে এবার রওনা হলো বেশ কিছুক্ষণ চিন্তাভাবনা করে। হাঁটু যেন যেতেই চাইছে না।অজানা আতংক, ভয় হৃদপিন্ডে ধুকধুক করছে প্রতিনিয়ত! মরনের ভয় তাড়া করে বেড়াচ্ছ মস্তিষ্কে। প্রানপণে হারিকেনটার আলো বাড়িয়ে দিয়ে জোরে, জোরে হাঁটতে লাগলো আজগর আলী। অনেকটা পথ এভাবে যেতে হবে।চার মিনিট যেতে হবে এভাবে জোরে জোরে হাঁটলেও।বুঝতেই পারছেন কতটা বিশাল আয়তন মুত্যুর ডাক "বাঁশ ঝাড়টা! আন্দাজ করা যায় তবে কখন কীভাবে অদৃশ্য জগতের আত্মা, অদৃশ্য জগতের সেই বিভৎস মানুষগুলোর সাথে কখন দেখা হয়ে যায় মনের অজান্তে, চোখের পলক না পড়তেই, দেখতে মন না চাইলেও কিন্তু ওরা দেখা দেয়।কি জন্য দেয়? সেটা যারা সেই পরিস্থিতি সম্মুখীন হয়েছে তারাই ভালো বলতে পারবে। এমন পরিস্থিতির সম্মুখে দাঁড়িয়ে যে কেউ আজান্তেই ভয় পাবে এটাই স্বাভিক এটাই মানতে হবে।কারণ অদৃশ্য জগতের মৃত মানুষের সাথে আমাদের সব সময় দেখা হয় নাএবং তারা আমাদের মতো স্বাভিক নয়। মনে, মনে এমন হাজারও চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে আজগরের মাথায়।দু'পা যেন সামনে এগোতেই চাইছে না বরংচো পিছু ফিরে যেতে বলছে। মনে হয় সামনে নয় পিছনে ফিরে গেলে ভালোহবে অন্তত আজকের রাতটা জন্যে। এদিকে এসব ভাবতে, ভাবতে, হাঁটছে তো হাঁটছে, বেশ জোরে, জোরে কিন্তু পথ তো শেষ হচ্ছে না! বরংচো তার কেনজানি মনে হলো সে একি জায়গাতেই হেঁটে, হেঁটে ফিরে আসছে। অজানা আতংকে ঠোঁটগুলো কাঁপা শুর করলো।চিৎকার দিতে ইচ্ছে হলেও মুখ দিয়ে সেই চিৎকার দেওয়ার মতো শক্তির জোগান হচ্ছে না। কিন্তু এই বার বার এক পথে একি জায়গাতে সে বার বার আসছে কেন? এটার রহস্য কী? এর মানে কী? এমন প্রশ্নের জবাব আপাতত নাই আজগরের কাছে। তবে এতোটুক সে আন্দাজ করেছে সে কোনো অদৃশ্য অশুভের ফাঁদে পড়েছে।তাই সে হারিকেনের আলো আরও বাড়িয়ে দিল।এবং সোজা, একদম নাক বরাবর হাঁটতে শুরু করেছে।তবে পা চলছে না।ইতিপর্বে একি জায়গাতে অধিকবার যেয়ে শক্তি কমে গিয়েছে তার মধ্যে অজানা আতংক! মানসীক চাপ সব মিলিয়ে সে ক্লান্ত! তার মানে এই নয় সে ফিরে গিয়েছে।সবে মাত্র শুরু হলো সেই অদৃশ্য জগতের অশুভ আত্মাদের কর্ম। একটু দূর যেতেই পিছন থেকে প্রচুর কাঁন্নার শব্দ।যখন বাচ্চারা কাঁন্না করে সেই সময় যেমন সেই কাঁন্নার শব্দ শুনা যায়! তেমন নয়।একটু ভিন্ন।পিছন থেকে যে কাঁন্নার শব্দ আসছে সেটা নিশ্চিত বাচ্চাদের কাঁন্না তবে শব্দটা অন্য রকম রহস্যময়।আর কাঁন্নার মাঝে করুণ সুর।যেন সে খুব কষ্টে আছে।খুব কষ্টে। পুরো পরিবেশটা সেই বাচ্চা কাঁন্নার শব্দে থমথমে অবস্থা বিরাজমান। হালকা বাতাসে আবার মৃদু হাসির শব্দও এখন! কী করব! ভাবলো আজগর। মনে, মনে ভীষণ বকা দিতে ইচ্ছে করছে তার বড় ভাই সাইফুদ্দীন কে। সে বলেছিল তুই যা বাজারে আমি একটু পর আসছি। তার আশায়, থেকে আজ এই পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছে আজগরকে। মৃদু হাসির শব্দটা আসার পর বাচ্চাটার কাঁন্না থেমে গেল।আজীব তো? মৃদু হাসির সাথে কাঁন্নার সম্পর্ক কী? তবে সেই মৃদু হাসির মধেও রয়েছে অস্বাভিক রহস্য।পৃথিবীর মানুষ স্বাভিক হাসার যে শব্দ! তার সাথে সামান্যও মিল খুঁজে পাওয়া যায় নি সেই হাসির। ইতিমধ্যে হালকা বাতাসটা জোরালো হচ্ছে ধীরে, ধীরে।বাঁশ ঝাড়ের ফাঁকে মনে হয় কেউ লক্ষ্য রেখেছে আজগর এর দিকে।মনে হয় কোনো একজন পিছনে, পিছনে আসছে তবে তাকে দেখছে না আজগর। ঝোপ ঝাড়ের ভিতরে টুকটাক শব্দ।গ্রামের বিস্তর জমিন থেকে শিয়ালের করুন সুরে কাঁন্নার শব্দ, আর এই মৃত্যুরডাক বাঁশ ঝাড়ের সেই বাচ্চার কাঁন্না আবার মৃদু হাসি যা রহস্যময় এবং মৃদু বাতাস থেকে জোরে জোরে বাতাসের গতিবেগ বেড়ে যাওয়া এবং পিছনে পিছনে কেউ আসছে যা তার চোখে দেখা যাচ্ছে না এই পরিস্থিতিতে হঠাৎ আজগরকে কোনো এক অদৃশ্য কিছু টেনে নিয়ে জঙ্গলে ভেতরে নিয়ে যাচ্ছে।কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও সেই অদৃশ্যের কিছুর কাছ থেকে নিজেকে ছাড়াতে পারছে না আজগর।প্রানপণে চেষ্টা করছে তবে সব বৃথা। চাপা কাঁন্নার শব্দটা বেড়ে গেল আজগরের। জোরে, জোরে চিৎকার দিয়ে জানে শরীরের শক্তি কমা ছাড়া কোনো লাভ হবে না।কারণ সেই চিৎকার কারোকানে যাবেও না।তবে গেলে কেউ আসবেও না।যেহেতু এই মৃত্যুর ডাক বাঁশঝাড় থেকে প্রায় কিছুদিন পর পর চিৎকার করে কাঁন্নার শব্দ কাছেরবাড়ির মানুষগুলো শুনতে পায়। হারিকেনটা ছিটকে পড়ে গিয়েছে, ঝুঁড়িটাওপড়ে গিয়েছে। ঘুটঘুটে অন্ধকার এর মধ্যে টেনে হিছড়ে আজগরকে নিয়ে যাচ্ছে একদম ভিতরের দিকে। লোকে বলে একদম ভিতরে একটু ছোট্ট পুকুর রয়েছে।ইতিপূর্বে দুইজনের মৃত দেহ সেখানে পাওয়া গিয়েছিল।তবে কিভাবেমরেছে। এটা কী খুন! নাকি অন্য কোনো রহস্য তা কেউ জানতে পারেনি আজ অবধি। সেখানেই নিয়ে যাচ্ছে।এতো টানা টানির পর আর ভয়ে আজগর অজ্ঞান হয়ে যায়। কিছুদিন পর খোঁজ মিলে আজগরের। হারিকেনটার কেরোসিন কিছুটাজায়গায় তরলের মতো, আর ঝুঁড়িটা কিছুদূর পড়ে আছে। আর এর ঠিক সামনে বেশ ভিতরে ছোট্ট সেই পুকুরটাতে অর্ধ লাশ ভেসে আছে।
Showing posts with label বাংলা সত্য ঘটনার গল্প. Show all posts
Showing posts with label বাংলা সত্য ঘটনার গল্প. Show all posts
Sunday, July 8, 2018
পদস্খলিত ভালোবাসা... এবং কিছু অব্যক্ত কষ্ট
অন্ধকার আজকাল বড্ড ভালো লাগে....অথচ একটা সময় দিনের আলো ছিল আমার ভীষণ প্রিয়। প্রতিদিন নতুন ভোরের অপেক্ষায় থাকতাম আমি ।...একএকটা ভোর কি অদ্ভুত রকম সুন্দর হত তখন! এক একটা ভোর যেন নতুন এক একটা গল্পের শুরু।.. কালে কালে বেশ খানিকটা পথ আজ পেরিয়ে এসেছি।...এখনকার ভোরগুলো আর আগের মতন সুন্দর হয় না, নতুন কোন গল্পের কথাও বলে না.... ভোরগুলো এখন বড্ড বেশি একঘেয়ে, একপেশে!....তাই অন্ধকারই আজ আমার জীবনের সবচেয়ে কাছের বন্ধু। আমারসব গোপনীয়তার, কান্নার আর দীর্ঘশ্বাসের নীরব সাক্ষী।..... কপট বন্ধুদের চেয়ে যদিও এই বন্ধুই ঢের ভালো।....কোন উপকারে না আসুক, অপকার করার অন্তত কোন অভিপ্রায় নেই তার। হ্যাঁ...আমার জীবন এখন সত্যিকারের বন্ধুহীন। এমনকি বন্ধুত্ব শব্দটাই বড্ড বেশী মিথ্যা আরলোক দেখানো মনে হয় আজকাল। স্বজনদের উপস্থিতিও কদাচিৎ, কালেভদ্রে ঘটে। প্রিয় মানুষ বলতে এই দুনিয়ায় একজনই অবশিষ্ট আছে কেবল। যার মুখের দিকে তাকিয়েই স্বেচ্ছামৃত্যুর বিষ পান করা হয়ে উঠছে না।.. আর একজন প্রিয় মানুষ ছিল...সবার চেয়ে প্রিয়...হয়তো মায়ের চেয়েও...স্বার্থপরের মত শোনাচ্ছে, তাইনা?... জানি। তবু এটাই হয়তো সত্যি! ২৪ ঘন্টা যাকে ঘিরে আমার সময়, স্বপ্ন, ভবিষ্যত, সুখ, আনন্দ, চাওয়া-পাওয়া সব আবর্তিত হত...সেই একজনই আমার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় মানুষ ছিল! জীবনের গোলমেলে হিসাবের ব্যাপারে আমার কোনকালেই কোন ধারণা ছিল না। এতটাই সহজ সরল ছিল জীবনটা। অথচ যে মানুষটার হাতে পরম বিশ্বাসে জীবনটা নির্ভার ভাবে ছেড়ে দিয়েছিলাম, সে আমাকে ঠকালো! বীভৎস ভাবে ঠকালো। দিনের পর দিন তার বদলে যাওয়া নিষ্ঠুর মারমুখী ব্যবহার, অপমান, ৮ বছরের সবগুলো মুহুর্তের কথা, প্রতিশ্রুতির কথা অকপটে অস্বীকার করা...... এসব কিছু আমাকে জীবনেরসেই অন্ধকার দিকটাকে চিনতে শেখালো যার সম্পর্কে আমরা পূর্ব কোন ধারণাই ছিল না।...এমন সব ভয়াবহ কুৎসিত সব মিথ্যা আর নিষ্ঠুরতার মুখোমুখি হলাম আমি, যে নিষ্ঠুরতা এ জীবন আগে কখনো দেখে নি।.. পরম বিশ্বাসে একদিন যে মানুষটার হাত ধরেছিলাম, যে মানুষটার উপর ভরসা করে দীর্ঘ ৮ টা বছর অপেক্ষা করলাম, কেমন অদ্ভুত ভাবে সে বদলে গেল...। যে স্বপ্নটাকে ছুঁয়ে দেখবো বলে জীবনের চলার পথের সব বাহুল্যগুলো ঝেড়ে ফেলে দিয়েছিলাম, সেই স্বপ্নের দিকে যতই এগিয়ে চাইছিলাম, স্বপ্নটা ততই দূরে সরে যাচ্ছিল...স্বপ্নের পিছনে ছুটতে গিয়ে একটা সময় খেয়াল করে দেখলাম, যার হাত ধরে ছুটে চলেছি এতটা পথ,সে আমার হাতটা অনেক আগেই ছেড়ে দিয়েছে...তার জন্য বাহুল্য ভেবে যাদের একটা সময় নিঃসংকোচে ঝেড়ে ফেলে দিয়েছি, তারাও আজ দৃষ্টিসীমারবাইরে হারিয়ে গেছে... জীবন নামের মহাসমুদ্রে আমি আজ বড্ড একা।...একটা সময় ছিল যখন মনে হত হাবুডুবু খেয়ে হলেও বাঁচি, বেঁচে থাকার চেষ্টা করি।....ঈশ্বরের কাছে প্রতি মুহুর্ত প্রার্থনা করতাম, আমার বিশ্বাস তুমি ভেঙ্গে দিও না! ... ৮ বছরে তিলে তিলে মানুষটার চরিত্রের যে অবয়ব আমি মনের ভেতর তৈরি করে নিয়েছি, যেমন জেনেছি তাকে...সেই বিশ্বাসটা, সেই অবয়বটা তুমি মিথ্যা করে দিও না... ঈশ্বর আমার প্রার্থনা শোনেন নি! পরম ভালোবাসা, মমতা আর বিশ্বাসে বছরের পর বছর ধরে তৈরি করা অবয়বটা কেবল যেন বদলে গেছে...!!! যেন কেউ এসিড নিয়ে ঝলসে অবয়ব টাকে কুৎসিত করে দিয়ে গেছে।............. এখন আর বেঁচে থাকার চেষ্টা করি না! বিশ্বাস যেখানে এতটা ঠুনকো, মানুষ যেখানে এতটাই পদস্খলিত.... মানুষের বিবেক যেখানে মমির অস্তিত্ব নিয়ে ঠিকে আছে কেবল, সেখানে হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসা নিয়ে বেঁচে থেকে কি লাভ??।... তার চেয়ে বরং জীবনের স্রোত ই আমাকে নিরুদ্দেশে ভাসিয়ে নিয়ে যাক....যাক না...ক্ষতি কি তাতে! জানেন তো, চারপেয়ে জানোয়ার আঘাত করলে গভীর ক্ষত তৈরি হয়, যত্নে তা আবার সেরেও যায়। কিন্তু দো-পেয়ে জানোয়ারেরদাঁতে এতটা বিষ থাকে, এর আঘাতে মৃত্যু অনিবার্য! বলছি তার কথা, যার হাত ধরে মরীচিকার পেছনে কোন দিকে না তাকিয়ে দিনমান এক করে ছুটে চলেছি অনেকগুলো বছর। মনুষ্য জীবনের সবচেয়ে গূরুত্বপূর্ণ সময়গুলো সম্ভবত! যার মুখোশবিহীন কদর্য চেহারাটা আমার দু'চোখের পাতা আজ আর এক করতে দেয় না! যার নিখু্ঁত নিপাট ভালোমানুষীর অভিনয় আমাকে প্রতি মুহুর্ত আমাকে আঘাত করে চলেছে, ভোরের আকাশ, শরতের কাশফুল, বৃষ্টি ভেজা সেঁদো মাটির গন্ধ, কদম ফুল, ঝড় কোন যা কিছুতেএ জীবনে ভালোলাগা কাজ করতো, তার কোন কিছুই আজ আর আমাকে স্পর্শ করেনা! অভিশপ্ত একটা জীবন্মৃতের জীবন কাটাচ্ছি আমি শুধু একজনকে বড্ড বেশি ভালোবেসেছিলাম বলে, বিশ্বাস করেছিলাম বলে!....সত্যিকার ভালোবাসায় এরচেয়ে উত্তম প্রতিদান আর কি হতে পারে বলুন তো!!.... আমার সাজানো গোছানো জীবনটাকে ছিবড়ে খাবলে ক্ষত বিক্ষত, করে দিয়ে নতুন মাংসে মুখ গুজেছে সে আজ!.....সেই মাংস খোঁজায় কোন লজ্জা নেই,দ্বিধা নেই...নেই কোন অপরাধবোধ! দো পেয়ে জানোয়ারেরা আসলে সব পারে...প্রতিশ্রুতি দিতে পারে, ভাঙতেও পারে। মানুষের ভালোবাসা আর আবেগ নিয়ে খেলতে পারে, খেলাতে পারে, স্বপ্ন দেখাতে পারে, ভাঙতেও পারে...একই মন দিয়ে অসংখ্য আমিনা কে ভালোবাসার কথা বলতে পারে, অসংখ্য জীবন নষ্টও করে দিতে পারে..... ...দীর্ঘযাত্রার ক্লান্তি আজ আমায় অনেকটা ধীর করে দিয়েছে! নতুন ভাবে চেনা কুৎসিত অবয়বটার পেছনে আমি এখন আর উন্মাদের মত ছুটে বেড়াই না!... তবে হ্যাঁ, পরম ভালোবাসা আর বিশ্বাসে তার যে অবয়বটা আমি দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে মনের ভেতর গড়ে তুলেছিলাম, সেই অবয়বটার জন্য দীর্ঘশ্বাস ফেলি আমি...আমারসব হারানোর বেদনা সেই সুন্দর অবয়বটার জন্য...কুৎসিত অবয়বটির জন্য সীমাহীন প্রচন্ড ঘৃণা ছাড়া আর কিচ্ছু অবশিষ্ট নেই আমার ভেতরে !... এখন বেঁচে থাকার চেষ্টা করার চাইতে তাকিয়ে দেখে যাওয়াটাই আমারসহজ মনে হয়... আমি বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে দেখি, চিরায়ত সেই নাটকের পটভূমিকা আর চিত্রনাট্য একই রয়ে গেছে। শুধু বদলে গেছে নটী। নটের ভূমিকা সেই আগের মতই আছে..... জীবনে কখনও কোন কিছু নিয়ে আফসোস হয় নি। অথচ আজকাল একটা জিনিস নিয়ে মনের ভেতর প্রায় আক্ষেপ কাজ করে!....একজন নষ্ট মায়ের গর্ভ থেকে কেন জন্ম হলো না আমার..?? তাহলে হয়তো আমিও দোপেয়ে জানোয়ারদের মত খেলতে শিখতাম, স্বপ্ন বেঁচেখাওয়া ব্যাভিচারী হতাম, এক শরীর থেকে আরেক শরীর, এক মন থেকে আরেক মনে মুখ গুঁজে লালসা মেটাতে জানতাম, জানতাম কি করে হত্যা করতে হয় এক একটা জীবন আর এক একটা স্বপ্ন.... শেষ করছি একটা ছোট্ট ঘটনা দিয়ে। আমার কাছের এক ছোট বোন হোস্টেলে থাকে। গতকাল তার হোস্টেলের এক মেয়ে আত্মহত্যা করেছে। কারণ চিরায়ত সেই প্রতারণা। প্রতারক প্রেমিকের প্রতারণার কষ্ট আর আঘাত সহ্য করতে পারে নি মেয়েটি। বেঁচে থাকার চাইতে মৃত্যুই তার কাছে সহজ মনে হয়েছে। অনেকেই আত্মহত্যার বিপরীতে কথা বলবে...আত্মহত্যা কাপুরুষের কাজ.... আরোও কত শত মন্তব্য আর অপবাদ রয়েছে আত্মহত্যাকারীর জন্য। কিন্তু একটা মেয়ে যখন কাউকে সত্যি ভালোবাসে সে ভালোবাসা যে কতটা তীব্র হতে পারে, প্রেমিকরূপী জানোয়ারগুলোর তা উপলব্দি করার ক্ষমতা নেই। তাইতো তারা ভালোবাসার নাটক করে প্রেমের ফাঁদে ফেলে নিস্পাপ প্রাণগুলোকে মৃত্যুর পথ বেছে নিতে বাধ্য করে। আর নিজেরা আনন্দ আর ভালোবাসার ফেরি করে চলে এক মন থেকে আরেক মনে, এক শরীর থেকে আরেক শরীরে!... এক বুক কষ্ট, অভিমান আর অপমান নিয়ে যে মেয়েটা পরপারে হারিয়ে গেল, একটা নষ্ট পুরুষের জন্য জীবন যে মেয়েটাকে তার সব পাওনা থেকে বঞ্চিত করলো সেই প্রতারক কুকুরটাকে আইনের আওতায় এনে আত্নহত্যার প্ররোচনা দেয়ার জন্য কেউ তার শাস্তির কথা বলবে না কখনও....আর এই সুযোগেই জানোয়ারগুলো একটার পর একটা মেয়ের জীবন ভালোবাসার নামে নষ্ট করতে থাকবে।... বোকা মেয়ে তুমি সোনালী! একটা সময় তোমার মত ভুল আমিও করতে যাচ্ছিলাম। বিশ্বাস করো, তোমার মৃত্যুতোমার ভন্ড প্রেমিকের পুরুষালি লালসা এতটুকুও কমাবে না, আরেকটা মেয়ের শরীরে একই ভাবে কামড় বসানোর সময় তার এতটুকুও দ্বিধা হবে না,পুরুষাঙ্গ টা এতটুকুও কাঁপবে না তার.... !! অসৎ চরিত্রের এই পুরুষগুলোর জন্মই হয়েছে কুকুরের বীর্য থেকে। এদের ভেতর তাই নূন্যতম নৈতিকতা বোধও অনুপুস্থিত। এদের কাছে ঈশ্বর নেই, পাপ-পূণ্য, মৃত্যু বা পরকালের জবাবদিহিতার ভয় নেই। তাই এরা অবলীলায় শুধুমাত্র নিজেদের কামনা বাসনাকে চরিতার্থ করতে ঈশ্বরের নামে, এমন কি কুরআন ছুঁয়েও মিথ্যা শপথ করতে পারে। সমাজটার প্রতিনিধিত্ব এই মানুষরূপী জানোয়ারগুলোয় করছে। সমাজই এই জানোয়ারগুলোর সবচেয়ে বড় ঢাল। তুমি আত্মহত্যাকারী নও, তোমাকে আত্মহত্যা করতে তোমার প্রতারক প্রেমিক বাধ্য করেছে, এই সত্যিটা এইকুকুরশাসিত সমাজ কখনো মেনে নেবে না। তাই ভালোবাসার কথা বলে তোমার জীবন নষ্ট করার দুঃসাহস যে কুকুরটা দেখিয়েছে, তাকে শাস্তি দিতেই তোমাকে বেঁচে থাকতে হত!... শাস্তি ওদের অবশ্যই প্রাপ্য। তা নইলে এই সব কুকুরগুলোর ভ্রণ থেকে ভবিষ্যতে আরো অসংখ্য নষ্ট পচে যাওয়া সত্ত্বা জন্ম নেবে .....অসংখ্য শ্ব-দন্ত জানোয়ার বাধ্য করবে অসংখ্য আমিনা বা সোনালীদের আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে........শাস্তি তোমাকেই দিতে হত সোনালী। অথচ তুমি মরে গেলে....তুমি মরে গিয়ে আবারও প্রমাণ করে দিয়ে গেলে 'মানুষ হয়ে জন্মানোতে কলি যুগে কোন সার্থকতা নেই। এ যুগ নষ্ট ভ্রণ থেকে জন্ম নেয়া দোপেয়ে জানোয়ারদের যুগ!'

Saturday, July 7, 2018
বাংলা ভূতের গল্প(ভুতু আমার সঙ্গে একটা ছবি তোলো)
গল্পটি লিখেছেন মোঃ জাফর ইকবাল
রাত ১১ টা। বাড়িতে পড়ার টেব্লে দুলে-দুলে বাংলা পড়ছিল ছ’বছরের একটি ছোট্ট মেয়ে। হঠাৎ তার মা মোবাইল নিয়ে এসে তাকে বললেন, ‘‘কথা বল, ফোনে।’’ ফোন ধরে অত্যন্ত সাবলীলভাবে ‘‘হ্যালো’’ বলল আর্শিয়া মুখোপাধ্যায়। যেন ফোনটা তার কাছে আসার কথা ছিল। প্রতিবেদক তার কাছে অচেনা। কিন্তু অচেনা কণ্ঠস্বরের প্রভাব বিন্দুমাত্র আঁচ ফেলেনি আর্শিয়ার গলায়। ‘হ্যালো’ বিনিময়ের পর মিষ্টি সুরেলা স্বরে সে প্রতিবেদককে জিজ্ঞেস করল, ‘‘কেমন আছ তুমি?’’ গত একমাস হল নিয়মিত স্কুলে যাচ্ছে আর্শিয়া। সিরিয়াল চলাকালীন যা হত না। জি ডি বিড়লা স্কুলে ক্লাস ওয়ানের ছাত্রী সে। এই এপ্রিলে ক্লাস টু হবে। ‘‘এখন মেয়ের পড়াশোনায় বেশ মন। রোজ স্কুল থেকে এসে প্রথমেই আমাকে বলে, মা, আজ এর সঙ্গে ঝগড়া করলাম, কাল ওর সঙ্গে ভাব করলাম, আজ এই খেলাটা খেলেছি। স্কুলের আন্টি আমাকে গুড দিয়েছে। এমন হাজারো কথা…’’ গলায় পরম তৃপ্তি আর্শিয়ার মা ভাস্বতী মুখোপাধ্যায়ের। সিরিয়াল চলার সময় প্রতিদিন স্কুলে যাওয়া না হলেও মেয়ের পড়াশোনায় ফাঁক পড়তে দেননি ভাস্বতী। শ্যুটিংয়ের ফাঁকে আলাদা ঘরে মেয়েকে নিয়ে বসে যেতেন, কখনও ছড়া শেখাতে কখনও ম্যাপ দেখে দেশ চেনাতে। তুমি বড় হয়ে কী হতে চাও? উত্তর দিতে বেশি সময় নিল না সে, ‘‘ডাক্তার।’’ তুমি যে এত ভাল অভিনয়করো, বড় হয়ে অভিনেত্রী হতে চাও না? প্রশ্ন শুনে আর্শিয়ার পরিষ্কার উত্তর, ‘‘না, অভিনেত্রী নয় ডাক্তারই হব।’’ শ্যুটিং না স্কুল, কোনটা বেশি মজার? এই প্রশ্নের উত্তর সে দিল একেবার পাকা অভিনেত্রীর মতো, ‘‘দুটোই।’’ এই ‘দুটো’ থেকে তাকে কিছুতেই সরানো গেলনা। সমবয়সি অন্যান্য বাচ্চাদের চেয়ে সে যেন একটু বেশিই পরিণত! এটাকি তার জীবনে নতুন সংযোজন নাকি বরাবরই সে এমন? ‘‘ও বরাবর ম্যাচিওর্ড। কোনও বিজ্ঞাপন বা সিনেমা দেখে তা নকল করার অভ্যেস ওর ছোট থেকেই। ওর বাবার (দীপঙ্কর মুখোপাধ্যায়) চাকরিসূত্রে আমরা যখনরাজস্থানে থাকতাম, তখন ওর তিন বছর বয়স। একদিন হঠাৎ দেখি ও কাঁদছে।আমি শশব্যস্ত হয়ে বললাম, ‘কী হয়েছে?’ বলল, ‘কিছু না অভিনয় করছি।’ টিভিতে দেখেছে নায়িকা কাঁদছে, ও সেটাকে নকল করছিল। একদিন অটো স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে আছি, হঠাৎ বলছে, ‘ছোড় দো..ছোড় দো…’’ আমি ভয় পেয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী হল?’ হেসে বলল, ‘অ্যাকটিং করছি মা।’ বুঝুন!’’ হেসে বললেন ভাস্বতী। যে বিল্ডিংয়ে আর্শিয়া থাকে, সেখানে তাঁর বয়সি ছেলেমেয়ে কম, কাছাকাছি খেলার মাঠও নেই। তাই স্কুল থেকে ফিরে আর্শিয়া কখনও মায়ের তৈরি তার প্রিয় পুডিংয়ের বাটি নিয়ে কখনও আবার তার মনের মতো চিকেন খেতে-খেতে মজে যায় টিভিতে প্রিয় কার্টুন ডোরেমনে। ভাল লাগার জিনিসের মধ্যে আর্শিয়ার সবচেয়ে প্রিয় বার্বি ডলকে। ‘‘জানো, আমার বার্বির দুটো স্যুটকেস আছে, মাফলার আছে, বাড়ি আছে, অনেকগুলো জামা-জুতো আছে! আমি ওকে রোজ সাজাই। দিদির সঙ্গে বার্বি নিয়ে খেলি,’’ আহ্লাদ ঝরে পড়ল আর্শিয়ার গলায়। সেলেব্রিটি মুকুটটা খুলে রেখে আর পাঁচটা সাধারণ বাচ্চার মতো, বাবা-মা, দিদির সঙ্গে জীবন কাটছে তার। কিন্তু মুকুট না থাকলেও সে এখনও অনেকের নয়নের মণি। মা, ভাস্বতী তাই যেন একটু দুঃখ করেই বললেন, ‘‘আগের মতোওকে সর্বত্র নিয়ে যাওয়া মুশকিল। এই তো দেখুন না, সেদিন একটা বিয়ে বাড়ি গিয়েছি, নিমন্ত্রিতরা বউকে আগে না দেখে সকলের একটাই আবদার, ‘ভুতু আমার সঙ্গে একটা ছবি তোলো।’ খুব অস্বস্তি লাগছিল। সমবয়সিদেরসঙ্গে খেলতে পারছিল না বলে বেচারা প্রায় কেঁদেই ফেলে। তাই এখন খুবপরিচিত জায়গা না হলে ওকে নিয়ে যাই না।’’ মাত্র এক মাস হয়েছে সিরিয়াল থেকে ছুটি পেয়েছে আর্শিয়া কিন্তু এর মধ্যেই অন্য সিরিয়ালের অফার এসেছে ভাস্বতী ও দীপঙ্করবাবুর কাছে। কিন্তু তাঁরা চাইছেন আরও বেশ কিছুদিন তাঁর মেয়ে এই স্বাভাবিক জীবনে থাকুক। তারপর তাঁরা ভেবে দেখবেন মেয়ে অভিনয় করবে কি না। আর্শিয়া অবশ্য নিজে এখন স্কুল নিয়েই মেতে আছে। শুধু একটা জিনিসই সে খুব মিস করে।সেটা পটেটো চিপস। সিরিয়ালের শ্যুটিংয়ের সময় নবীনা সিনেমা হলের মালিক তাকে রোজ এক প্যাকেট করে চিপস উপহার দিত। সেটা আর পাওয়া হচ্ছে না। এইটুকুই যা দুঃখ!
রাত ১১ টা। বাড়িতে পড়ার টেব্লে দুলে-দুলে বাংলা পড়ছিল ছ’বছরের একটি ছোট্ট মেয়ে। হঠাৎ তার মা মোবাইল নিয়ে এসে তাকে বললেন, ‘‘কথা বল, ফোনে।’’ ফোন ধরে অত্যন্ত সাবলীলভাবে ‘‘হ্যালো’’ বলল আর্শিয়া মুখোপাধ্যায়। যেন ফোনটা তার কাছে আসার কথা ছিল। প্রতিবেদক তার কাছে অচেনা। কিন্তু অচেনা কণ্ঠস্বরের প্রভাব বিন্দুমাত্র আঁচ ফেলেনি আর্শিয়ার গলায়। ‘হ্যালো’ বিনিময়ের পর মিষ্টি সুরেলা স্বরে সে প্রতিবেদককে জিজ্ঞেস করল, ‘‘কেমন আছ তুমি?’’ গত একমাস হল নিয়মিত স্কুলে যাচ্ছে আর্শিয়া। সিরিয়াল চলাকালীন যা হত না। জি ডি বিড়লা স্কুলে ক্লাস ওয়ানের ছাত্রী সে। এই এপ্রিলে ক্লাস টু হবে। ‘‘এখন মেয়ের পড়াশোনায় বেশ মন। রোজ স্কুল থেকে এসে প্রথমেই আমাকে বলে, মা, আজ এর সঙ্গে ঝগড়া করলাম, কাল ওর সঙ্গে ভাব করলাম, আজ এই খেলাটা খেলেছি। স্কুলের আন্টি আমাকে গুড দিয়েছে। এমন হাজারো কথা…’’ গলায় পরম তৃপ্তি আর্শিয়ার মা ভাস্বতী মুখোপাধ্যায়ের। সিরিয়াল চলার সময় প্রতিদিন স্কুলে যাওয়া না হলেও মেয়ের পড়াশোনায় ফাঁক পড়তে দেননি ভাস্বতী। শ্যুটিংয়ের ফাঁকে আলাদা ঘরে মেয়েকে নিয়ে বসে যেতেন, কখনও ছড়া শেখাতে কখনও ম্যাপ দেখে দেশ চেনাতে। তুমি বড় হয়ে কী হতে চাও? উত্তর দিতে বেশি সময় নিল না সে, ‘‘ডাক্তার।’’ তুমি যে এত ভাল অভিনয়করো, বড় হয়ে অভিনেত্রী হতে চাও না? প্রশ্ন শুনে আর্শিয়ার পরিষ্কার উত্তর, ‘‘না, অভিনেত্রী নয় ডাক্তারই হব।’’ শ্যুটিং না স্কুল, কোনটা বেশি মজার? এই প্রশ্নের উত্তর সে দিল একেবার পাকা অভিনেত্রীর মতো, ‘‘দুটোই।’’ এই ‘দুটো’ থেকে তাকে কিছুতেই সরানো গেলনা। সমবয়সি অন্যান্য বাচ্চাদের চেয়ে সে যেন একটু বেশিই পরিণত! এটাকি তার জীবনে নতুন সংযোজন নাকি বরাবরই সে এমন? ‘‘ও বরাবর ম্যাচিওর্ড। কোনও বিজ্ঞাপন বা সিনেমা দেখে তা নকল করার অভ্যেস ওর ছোট থেকেই। ওর বাবার (দীপঙ্কর মুখোপাধ্যায়) চাকরিসূত্রে আমরা যখনরাজস্থানে থাকতাম, তখন ওর তিন বছর বয়স। একদিন হঠাৎ দেখি ও কাঁদছে।আমি শশব্যস্ত হয়ে বললাম, ‘কী হয়েছে?’ বলল, ‘কিছু না অভিনয় করছি।’ টিভিতে দেখেছে নায়িকা কাঁদছে, ও সেটাকে নকল করছিল। একদিন অটো স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে আছি, হঠাৎ বলছে, ‘ছোড় দো..ছোড় দো…’’ আমি ভয় পেয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী হল?’ হেসে বলল, ‘অ্যাকটিং করছি মা।’ বুঝুন!’’ হেসে বললেন ভাস্বতী। যে বিল্ডিংয়ে আর্শিয়া থাকে, সেখানে তাঁর বয়সি ছেলেমেয়ে কম, কাছাকাছি খেলার মাঠও নেই। তাই স্কুল থেকে ফিরে আর্শিয়া কখনও মায়ের তৈরি তার প্রিয় পুডিংয়ের বাটি নিয়ে কখনও আবার তার মনের মতো চিকেন খেতে-খেতে মজে যায় টিভিতে প্রিয় কার্টুন ডোরেমনে। ভাল লাগার জিনিসের মধ্যে আর্শিয়ার সবচেয়ে প্রিয় বার্বি ডলকে। ‘‘জানো, আমার বার্বির দুটো স্যুটকেস আছে, মাফলার আছে, বাড়ি আছে, অনেকগুলো জামা-জুতো আছে! আমি ওকে রোজ সাজাই। দিদির সঙ্গে বার্বি নিয়ে খেলি,’’ আহ্লাদ ঝরে পড়ল আর্শিয়ার গলায়। সেলেব্রিটি মুকুটটা খুলে রেখে আর পাঁচটা সাধারণ বাচ্চার মতো, বাবা-মা, দিদির সঙ্গে জীবন কাটছে তার। কিন্তু মুকুট না থাকলেও সে এখনও অনেকের নয়নের মণি। মা, ভাস্বতী তাই যেন একটু দুঃখ করেই বললেন, ‘‘আগের মতোওকে সর্বত্র নিয়ে যাওয়া মুশকিল। এই তো দেখুন না, সেদিন একটা বিয়ে বাড়ি গিয়েছি, নিমন্ত্রিতরা বউকে আগে না দেখে সকলের একটাই আবদার, ‘ভুতু আমার সঙ্গে একটা ছবি তোলো।’ খুব অস্বস্তি লাগছিল। সমবয়সিদেরসঙ্গে খেলতে পারছিল না বলে বেচারা প্রায় কেঁদেই ফেলে। তাই এখন খুবপরিচিত জায়গা না হলে ওকে নিয়ে যাই না।’’ মাত্র এক মাস হয়েছে সিরিয়াল থেকে ছুটি পেয়েছে আর্শিয়া কিন্তু এর মধ্যেই অন্য সিরিয়ালের অফার এসেছে ভাস্বতী ও দীপঙ্করবাবুর কাছে। কিন্তু তাঁরা চাইছেন আরও বেশ কিছুদিন তাঁর মেয়ে এই স্বাভাবিক জীবনে থাকুক। তারপর তাঁরা ভেবে দেখবেন মেয়ে অভিনয় করবে কি না। আর্শিয়া অবশ্য নিজে এখন স্কুল নিয়েই মেতে আছে। শুধু একটা জিনিসই সে খুব মিস করে।সেটা পটেটো চিপস। সিরিয়ালের শ্যুটিংয়ের সময় নবীনা সিনেমা হলের মালিক তাকে রোজ এক প্যাকেট করে চিপস উপহার দিত। সেটা আর পাওয়া হচ্ছে না। এইটুকুই যা দুঃখ!







